বিষয়বস্তুতে চলুন

ফ্রান্সের ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ফ্রান্সের ইতিহাস
ধারাবাহিক নিবন্ধমালা
কেল্টজাতীয় গল
রোমান গল
ফ্রাঙ্ক্‌স
মধ্যযুগ
আদি আধুনিক ফ্রান্স
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিপ্লব
ফরাসি বিপ্লব
কারণসমূহ
এস্টেট্‌স-জেনারেল
ন্যশনাল এসেম্বলি
বাস্তিলের বিক্ষোভ
ন্যাশনাল কনস্টিটিউয়েন্ট
এসেম্বলি
(, , )
বিধানসভা
এবং রাজতন্ত্রের পতন
জাতীয় কনভেনশন
এবং রিজিওন অফ টেরর
ডিরেক্টরি
কনসুলেট
সম্পর্কিত: শব্দকোষ,
ঘটনাপঞ্জি, যুদ্ধসমূহ,
ব্যক্তিদের তালিকা,
ইতাহাস-রচনা
প্রথম সম্রাজ্য
পুনঃস্থাপন
জুলাই রাজতন্ত্র
দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র
দ্বিতীয় সম্রাজ্য
তৃতীয় প্রজাতন্ত্র
আধুনিক ফ্রান্স
ফরাসি বিপ্লব নিয়ে একটি পেইন্টিং

ফ্রান্স পশ্চিমা বিশ্বের প্রাচীনতম রাষ্ট্রগুলির একটি। এর ইতিহাস সমৃদ্ধ ও বিচিত্র। ফ্রান্সের সর্বপ্রথম অধিবাসীদের সম্পর্কে তেমন বিশেষ কিছু জানা যায় না। দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের গুহায় পাওয়া ছবিগুলি প্রায় ১৫,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের বলে অনুমান করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতক থেকে কেল্টীয় ও অন্যান্য গোত্রের লোকেরা ফ্রান্সে প্রবেশ করতে ও এখানে বসবাস করতে শুরু করে। প্রাচীনকালে ফ্রান্স অঞ্চলটি কেল্টীয় গল (Gaul) নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীন রোমানরা খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতকে ফ্রান্সের দখল নেয় এবং খ্রিস্টীয় ৫ম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত অঞ্চলটি শাসন করে।

রোমের পতনের পর অনেকগুলি রাজবংশ ধারাবাহিকভাবে ফ্রান্স শাসন করে। মধ্যযুগে রাজতন্ত্রের প্রভাব খর্ব হয় এবং স্থানীয় শাসকভিত্তিক সামন্তবাদের উত্থান ঘটে। ১৪শ থেকে ১৮শ শতক ধরে আবার রাজতন্ত্রের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়; এসময় ফ্রান্সের রাজারা ও তাদের মন্ত্রীরা ধীরে ধীরে একটি কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র ও বড় আকারের সামরিক বাহিনী গড়ে তোলেন। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং এর পর বহু দশক ধরে ফ্রান্স রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত হয়। এ সত্ত্বেও নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (Napoleon Bonaparte) শাসনামলে ফ্রান্স একটি সংহত প্রশাসনিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভ করে।

আধুনিক যুগে এসে ফ্রান্স নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ে পরিচিত হলেও এই পরিচয় তৈরি হতে তাকে বহু যুগ অপেক্ষা করতে হয়েছে। বর্তমানে ইউরোপের যে অংশটি ফ্রান্স নামে পরিচিত, কেবল মধ্যযুগ শেষ হবার পরেই তার আবির্ভাব ঘটে। কেবল ১৭শ শতকে এসেই ফরাসি ভাষা একটি আদর্শ রূপ গ্রহণ করে। ১৯শ শতক পর্যন্তও ফ্রান্সের এক-চতুর্থাংশ লোক আদর্শ ফরাসি নয়, বরং অন্য কোন ভাষায় কথা বলত। সংখ্যাগরিষ্ঠ ফরাসিদের ধর্ম রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্ম হলেও এতে ধর্মান্তরীকরণের ঘটনাও খুব ধীরে ধীরে ঘটে। ১৮শ শতকের আগ পর্যন্তও বেশির ভাগ ফরাসি ক্যাথলিক ধর্মের প্রথাগত আচার অনুষ্ঠান পালনে বিশ্বাসী ছিল না। একটি একত্রিত ফরাসি রাষ্ট্র তৈরি হতে বহু শতাব্দী লেগে যায়। ১৭৮৯ সালের আগ পর্যন্ত ফরাসি লোকেরা প্রায় ৪০০-র মত ভিন্ন ভিন্ন আইনি এলাকায় বাস করত। তারা একটি অভিন্ন জাতির নাগরিক ছিল না, বরং একই রাজার অধীনে প্রজা হিসেবে বাস করত। কেবল ১৯শ শতকে এসেই ফ্রান্সের প্রাদেশিক অর্থনীতিগুলি একত্রিত হয়ে একটি জাতীয় অর্থনীতিতে রূপ নেয়। বর্তমান ফ্রান্সের ইতিহাস প্রায় হাজার বছরের পুরনো হলেও এটি সর্বদা এরকম ছিল না। ইতিহাসের বহু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিগত শেষ কয়েক শতাব্দীতে এসেই এ অঞ্চলের বাসিন্দারা ধীরে-ধীরে ফরাসি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে শুরু করে।

ফ্রান্সের উন্নয়নে এর ভূগোল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফ্রান্স দেখতে অনেকটা ষড়ভুজের মত। দেশটি ইউরেশিয়া মহাদেশীয় ভূখণ্ডের পশ্চিম সীমানায় অবস্থিত। ফ্রান্সই ইউরোপের একমাত্র রাষ্ট্র যার দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত এবং ইউরোপের উত্তর সীমানা পর্যন্ত সীমান্ত আছে। ফ্রান্সই একমাত্র ইউরোপীয় রাষ্ট্র যার একপাশে আটলান্টিক মহাসাগর ও অন্যপাশে কেন্দ্রীয় ইউরোপ। এই ভৌগোলিক অবস্থান ফ্রান্সের অর্থনীতি, সরকার এবং সংস্কৃতির উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফ্রান্স ভূমি ও সাগর উভয় দিক থেকেই নিজেকে সর্বদা রক্ষার প্রয়াস পেয়েছে। দেশটি একটি শক্তিশালী স্থল সেনাবাহিনী গঠন করেছে এবং আধুনিক যুগে এসে একটী সমীহজাগানো নৌবাহিনীও গঠন করেছে। ফ্রান্সের দীর্ঘ তটরেখা এবং অনেকগুলি দীর্ঘ ও নাব্য নদীর কারণে রেল পরিবহনের প্রচলনের আগেই ফ্রান্সের ষড়ভুজের বিভিন্ন এলাকায় সহজেই প্রবেশ করা যেত। ফরাসি ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে উচ্চ পর্বতমালার অনুপস্থিতিও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক একত্রীকরণ সহজ করেছে।

কিন্তু তা সত্ত্বেও ফ্রান্সের ইতিহাসকে কেবল এর ভূগোলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক শক্তি নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শক্তিই ছিল ফ্রান্সের ষড়ভুজ একত্রীকরণের মূল চালিকাশক্তি। প্রাচীন রোমানেরাই প্রথমে এসে অঞ্চলটিকে একত্রিত করে। খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতকে রোমানরা তাদের বিশাল সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে বর্তমান ফ্রান্স অঞ্চল বা তৎকালীন গল অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করে। ৫ম শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে অঞ্চলটি রোমান ক্যাথলিক ধর্মের সূত্রে পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের সাথে যুক্ত হয়।

মধ্যযুগে অনেকগুলি রাজবংশ পরপর ফ্রান্স অঞ্চলটি শাসন করে। কিন্তু তারা কেউই বহু শতাব্দী যাবৎ এখানে একটি দক্ষ প্রশাসন স্থাপন করতে পারেনি। আধুনিক যুগের শুরুর পর্বে এসে বালোয়া ও বুরবোঁ রাজবংশগুলি একটি বৃহৎ সামরিক ও নাগরিক আমলাতন্ত্র গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, যার সাহায্যে রাজারা অঞ্চলটিতে শান্তি আনতে বং ফ্রান্সের সীমানা বাড়াতে সক্ষম হন। একটি একক রাজ্য প্রতিষ্ঠার এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে রাজবংশগুলি ফরাসিদের একটি নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

১৭৮৯ সালে ফ্রান্সের রাজতন্ত্র ইতিহাসের এক বিখ্যাত বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়। এর পর প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে ফ্রান্স রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় নিমজ্জিত হয়। বিপ্লবের ঐতিহ্যের ধ্বজাধারী ও তাদের বিরোধীদের মধ্যে সংঘাত চলতে থাকে। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মাঝেও দেশটি একটি আধুনিক শিল্পোন্নত অর্থনীতি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। ১৯শ শতকে ও ২০শ শতকের শুরুতে ফরাসি শক্তি ও আর্থিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। এই সময় ফ্রান্স বিশ্বজুড়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী একটি বিশাল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যও গড়ে তোলে, যদিও পরবর্তীকালে সেটি হারায়। এরপর ফ্রান্স দুইটি বিশ্বযুদ্ধের কেন্দ্রীয় জাতি হিসেবে অংশ নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রায় পুরোটাই ফ্রান্সের মাটিতে সংঘটিত হয় এবং এর ফলে দেশটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি উত্তর ফ্রান্স দখল করলে মধ্য ফ্রান্সের ভিশিতে (Vichy) একটি অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স তার ধূলিস্যাৎ অর্থনীতিকে আবার গড়ে তোলে এবং বিশ্বের একটি প্রধান শিল্পরাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। যুদ্ধের পরে ফ্রান্স নিউক্লীয় অস্ত্রের ক্ষমতা অর্জন করে, এবং শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে।

বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ফ্রান্সের উপনিবেশগুলিতে সাম্রাজ্যবিরোধী আন্দোলন জেগে ওঠে এবং এর ফলে ফ্রান্স অচিরেই তার বেশির ভাগ উপনিবেশ হারায়। ১৯৫৮ সালে আলজেরিয়ায় ফরাসিবিরোধী আন্দোলন ফ্রান্সকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। এসময় ফরাসি সরকার ২য় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম ফরাসি নেতা শার্ল দ্য গোল (Charles de Gaulle) একনায়কের ক্ষমতা দান করে। দ্য গোল বিশ্ব রাজনীতি অঙ্গনে ফ্রান্সকে অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। সাম্প্রতিককালে ফ্রান্স, জার্মানির সাথে একত্রে মিলে গোটা ইউরোপের অর্থনীতি ও ও রাজনীতির সমন্বয়ে প্রধান ভূমিকা রেখে চলেছে।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]